
লোকসভায় ধ্বনি ভোটে পাস ওয়াকফ বিল
লোকসভায় ধ্বনি ভোটে পাস ওয়াকফ বিল। ১২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনার পরে ধ্বনি ভোটে পাস ওয়াকফ বিল। জানালেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। বৃহস্পতিবার বিল পেশ হবে রাজ্যসভায়। বুধবার, কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু ‘ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫’ পেশ করেন । দিন ভর বিতর্ক চলে সংশোধিত ওয়াকফ বিল নিয়ে। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস-সহ একাধিক দলের সাংসদরা এর বিরোধিতা করেন। এর পরে বুধবার গভীর রাতে লোকসভায় এই বিল পাস হয়। জানা গিয়েছে, এই বিলের পক্ষে ভোট দেন ২২৬ জন সাংসদ।
ভোটাভুটি শুরুর আগে ওয়াকফ সংশোধনী বিলের প্রতিলিপি ছিঁড়ে প্রতিবাদে সরব হন এআইএমআইএমের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েসি। লোকসভায় বিল নিয়ে চর্চায় অংশ নেন তিনি। নিজের বক্তব্যের একেবারে শেষ দিকে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধির প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন হায়দরাবাদের সাংসদ। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের আনা আইনের বিরোধিতা করতে গিয়ে সেটির প্রতিলিপি ছিঁড়ে প্রতিবাদে সরব হন গান্ধিজী। ঠিক একইভাবে তিনি লোকসভায় বিলের প্রতিলিপি ছিঁড়ে প্রতিবাদে সরব হচ্ছেন। তাঁকে বলতে শোনা যায়, “ওয়াকফ সংশোধনী বিল অসাংবিধানিক । বিজেপি মন্দির-মসজিদের নাম করে দেশে বিভাজনের রাজনীতি করতে চায়। আমি এর বিরোধিতা করি ।” অন্যদিকে, সংশোধনী বিলের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধিও। সোশাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, “বিজেপি-আরএসএসের কাছে ওয়াকফ সংশোধনী বিল একটি অস্ত্র। এই অস্ত্র ব্যবহার করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের ব্যক্তিগত অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে তাদের সম্পত্তির উপর। এটা সংবিধানের উপর সরাসরি আঘাত। পাশাপাশি এর থেকে অন্য সম্প্রদায়ের বুঝে নেওয়া উচিত আগামিদিনে তাদের সঙ্গে কী কী হতে পারে।”এর আগে বুধবার দুপুর বারোটা নাগাদ লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করেন সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু।দিনভর চর্চার শেষে রিজিজু বলেন, “যারা বুঝতে চায় না তাদের বোঝানো যায় না । বিরোধী সাংসদরা বারবার বলছেন, এই বিল অসাংবিধানিক। তবে কেউ সেটা প্রমাণ করতে পারেননি । আমি মনে করি, অসাংবিধানিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।”মন্ত্রীর আগে, ওয়াকফ নিয়ে তৈরি যৌথ সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান জগদম্বিকা পাল বলেন, “আমার সৌভাগ্য আমি ওয়াকফ নিয়ে তৈরি জেপিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি। সংখ্যার জোরে সরকার চাইলে কোনও আলোচনা ছাড়াই বিল পেশ করতে পারত। কিন্তু আমাদের সরকার জেপিসি তৈরি করে সকলের সঙ্গে কথা বলেই সিদ্ধান্তে আসতে চেয়েছিল । গত পাঁচ মাসে আমরা 38টি বৈঠক করেছে। জেপিসির সমস্ত সদস্যর কাছে এটি একটি ঐতিহাসিক দিন। কারণ, সরকার কমিটির অধিকাংশ সুপারিশ মেনে নিয়েছে।” বিজেপি নেতা তথা পুরীর সাংসদ সম্বিত পাত্র বলেন, “দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের মধ্যে ভারতেই মুসলিমরা সব থেকে বেশি নিরাপদ। দেশের প্রথম মসজিদ তৈরি করতে জমি দিয়েছিলেন এক হিন্দু রাজাই। হিন্দুরা কাউকে দাস করে রাখেনি। সকলকে গ্রহণ করেছে। তুরস্ক থেকে শুরু করে লেবাননের মতো মুসলিম প্রধান দেশেও ওয়াকফের হাতে সম্পত্তির অধিকার নেই।”এর আগে বিরোধীদের তীব্র আক্রমণ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্ররমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি বলেন, “ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্যই ওয়াকফ বিল নিয়ে বিভ্রান্তকর প্রচার করা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলি নিজের স্বার্থে এই ধরনের অপপ্রচার করছে। তাদের তরফে বলা হচ্ছে, ওয়াকফের মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু বাস্তবে কেন্দ্রীয় সরকারের তেমন কোনও অভিপ্রায় নেই। ওয়াকফের সম্পত্তি যাতে সঠিক কাজে ব্যবহার করা যায় তারই উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।”লোকসভায় বুধবার ওয়াকফের সংশোধনী নিয়ে চর্চা চলাকালীন ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্যরা কেন থাকবেন তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। এই বিতর্কের জবাব দিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওয়াকফ বোর্ডের অমুসলিম সদস্যরা ধর্মীয় কাজে হস্তক্ষেপ করবেন না। তাঁদের একমাত্র কাজ ওয়াকফ ঠিক ভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না সেটা দেখা। আইন মেনে সবকিছু চলছে কিনা সেটা তাঁরা দেখবেন। এর সঙ্গে ধর্মীয় বিষয় কোনওভাবে জড়িত নয়।পাশাপাশি শাহ জানান, ওয়াকফ ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু, ওয়াকফ বোর্ডের সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। ওয়াকফ বোর্ড অন্য ট্রাস্টের মতোই একটি সংস্থা । এ প্রসঙ্গে, শাহ বিভিন্ন ট্রাস্টে থাকা চ্যারিটি কমিশনারের কথা বলেন এবং দাবি করেন, চ্যারিটি কমিশনার যে কোনও ধর্মের মানুষ হতে পারেন। তার জন্য তাঁর নিজের কাজ করতে কোনও সমস্যা হয় না। হিন্দু চ্যারিটি কমিশনার অন্য ধর্মের মানুষের হয়েও অনায়াসে কাজ করতে পারেন। এখানেও সেটাই করা হচ্ছে। এরপর 2013 সালে কংগ্রেস সরকারের আমলে হওয়া সংশোধনীর সমালোচনা করেন শাহ। তাঁর দাবি, 2014 সালে লোকসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে তাড়াহুড়ো করে এই সংশোধনী পাশ করেছিল কংগ্রেস। তার ফলে ওয়াকফ আইনটি বহু ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছিল। সেখানে এমন কিছু বিষয়ে যুক্ত করা হয়েছিল যার ফলে দুর্নীতি করার সুযোগ বেড়ে গিয়েছিল। আর সেই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকারকে এই সংশোধনী আনতে হল।