
স্কুলের হাল ফেরাতে এবার ‘ককরোচ’ আন্দোলন! সরকারি স্কুলে অডিটের ডাক, বাংলায় প্রাণ গেল আন্দোলনকারীর বাবার
শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে এবার নতুন করে আন্দোলনের পথে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা CJP। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো খতিয়ে দেখতে সমর্থকদের স্কুলে গিয়ে পরিস্থিতি অডিট করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের ‘Fix the Schools’ কর্মসূচিতে মূলত চারটি বিষয়ে নজর দেওয়া হচ্ছে—পানীয় জল ও সচল শৌচালয়, বিদ্যুৎ ও ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ, সীমানা প্রাচীর ও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা এবং মিড-ডে মিল ও শিক্ষকদের উপস্থিতি।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার করিসুন্ডা গ্রামের নিজের পুরনো প্রাথমিক স্কুলে গিয়েছিলেন ২৬ বছরের আবদুল হাফিজ। CJP-র স্কুল পরিদর্শন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই সেখানে গিয়েছিলেন তিনি। অভিযোগ, স্কুল থেকে ফেরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিজেপির স্থানীয় কর্মী পরিচয় দেওয়া কয়েকজন তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে এবং তাঁর বাবা মহম্মদ মাফিককে মারধর করেন। দু’দিন পর ৫১ বছরের মাফিকের মৃত্যু হয়।
ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী হামলাকারীদের ‘অপরাধী’ বলে দাবি করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে বিজেপির কোনও সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। তবে বাবাকে হারিয়েও নিজের অবস্থান থেকে সরতে নারাজ হাফিজ। তাঁর বক্তব্য, বাবার জন্য ন্যায়বিচারের লড়াই চলবে, কিন্তু সরকারি স্কুলের উন্নতির দাবিও থামবে না।
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, একটি সরকারি স্কুলের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে উন্নতির দাবি তোলার কারণে যদি কারও প্রাণ যায়, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংগঠনের তরফে হাফিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ক্ষতিপূরণের দাবিও তোলা হয়েছে। তবে হাফিজ তাঁর বাবার নামে একটি স্কুলের নামকরণের দাবি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, রাজস্থানেও সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে CJP-র কর্মসূচি শুরু হয়েছে। আলওয়ারে প্রাথমিক পড়ুয়াদের সঙ্গে বসে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিষ্কার শৌচালয় ও পানীয় জলের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেন সংগঠনের নেতা আশুতোষ রাঙ্কা। স্থানীয় প্রশাসন তাঁদের দাবিগুলি মেনে নিয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টে জানা যায়।
এরপর রাজস্থান সরকার সরকারি স্কুলে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং স্কুল চত্বরে ছবি বা ভিডিও করার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি করে। পড়ুয়াদের গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। CJP-র স্বেচ্ছাসেবকদের স্কুল পরিদর্শনের ঘোষণার পরেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা নীতি বিশেষজ্ঞ সামিনা বানোর মতে, ভারতের সরকারি স্কুল ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই একাধিক কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। শিক্ষকদের উপস্থিতি, শিক্ষার মান, পড়ুয়াদের শেখার ফলাফল এবং মিড-ডে মিলের মতো বিষয়গুলিতে নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সমস্যাগুলি সামনে আনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান তৈরি ও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলির মতে, CJP-র শক্তি মূলত সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর জনসংযোগ। প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো বড় সংগঠন না থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে কাজে যুক্ত করে তারা দ্রুত বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছতে পারছে। তবে এই মডেলের দুর্বলতাও রয়েছে। প্রশিক্ষিত সংগঠন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাবে স্বেচ্ছাসেবকেরা হামলা বা হিংসার মুখে পড়তে পারেন বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
এদিকে কলকাতায় পড়ুয়াদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য CJP-র একাধিক অনুষ্ঠান বাতিল বা অনুমতি না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংগঠনের নেতা আশুতোষ রাঙ্কা সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবি করেছেন, বাধা দেওয়া হলেও সরকারি স্কুলে গিয়ে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার কর্মসূচি চলবে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকাঠামো এবং সরকারি স্কুলের পরিস্থিতি নিয়ে ‘ককরোচ’ আন্দোলন আগামী দিনে আরও বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

