নেপাল-চিন সীমান্তে ফের উদ্ধার অভিযান, মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছুঁইছুঁই, নিখোঁজ প্রায় ৩ হাজার

ভয়াবহ হড়পা বানের পর নেপাল ও চিনে ফের জোরকদমে শুরু হল উদ্ধার অভিযান। নতুন করে তৈরি হওয়া একটি হ্রদ থেকে আচমকা জল নেমে আরও বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কায় কিছু সময়ের জন্য অভিযান বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে হওয়ায় ফের উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছে। নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মৃতের সংখ্যা অন্তত ৫৭৯ এবং নিখোঁজ ১,৯২৪ জন। চিনের তিব্বতেও অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে। ফলে দুই দেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৫৮০-র গণ্ডি পেরিয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যা আড়াই হাজারের কাছাকাছি। পরবর্তী আপডেটে নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বেড়ে ৬২৬ হয়েছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত বুধবার সকালে হিমালয়ের প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পড়ার পর। বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নদীর মধ্যে নেমে এসে প্রবল জলস্রোতের সৃষ্টি করে। সেই স্রোত লেন্দে নদী হয়ে নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার দিকে নেমে আসে। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ত্রিশূলী নদীর জলস্তর প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায় বলে জানা গিয়েছে। বহু গ্রাম, রাস্তা, সেতু এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উদ্ধার অভিযানে ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ৩,৭০০-র বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বহু দুর্গম এলাকায় রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকারীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে হেলিকপ্টার অভিযানও বারবার ব্যাহত হচ্ছে। এদিকে বিপর্যয়ের পর হিমবাহের ধ্বংসাবশেষে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। সেই হ্রদের জলস্তর বাড়তে থাকায় নতুন করে হড়পা বান নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে নেপাল ও চিনের উদ্ধারকারী দলকে সাময়িকভাবে অভিযান বন্ধ রাখতে হয়। পরে উপগ্রহ চিত্র ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর দেখা যায়, হ্রদের জল ধীরে ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং জলাধারের আয়তন কমছে। ফলে আপাতত বড় ধরনের দ্বিতীয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। চিনের তরফে বিপর্যয় মোকাবিলায় সেনা ও বিশেষজ্ঞ দল মোতায়েন করা হয়েছে। প্রায় ৫০০ জন সামরিক ও আধাসামরিক কর্মী উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছেন। চিনা প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংও দুর্গত সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। অন্যদিকে নেপালেও প্রায় ৩০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী উদ্ধার ও ত্রাণকাজে যুক্ত রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর জন্য ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং বিশেষ উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ভয়াবহ এই বিপর্যয়ে বহু বিদেশি নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন। তীর্থযাত্রী, পর্যটক, স্থানীয় কর্মী এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিকদের অনেকে এখনও নিখোঁজ। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলি একদিকে জীবিতদের খোঁজ চালাচ্ছে, অন্যদিকে কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধান করছে। আন্তর্জাতিক সাহায্যও পৌঁছতে শুরু করেছে। ভারত, রাষ্ট্রসংঘ, রেড ক্রস, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার তরফে ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং উদ্ধার সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। নেপাল ও চিনের প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হল যত দ্রুত সম্ভব দুর্গত এলাকায় পৌঁছে জীবিতদের উদ্ধার করা এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা।

error: Content is protected !!